তীব্র তারল্য সংকটে বেসরকারি খাত

বেসরকারি খাত চাঙ্গা করতে নগদ অর্থপ্রবাহ বাড়াতে হবে

দেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের অবদান সবচেয়ে বেশি, ৮৬ শতাংশ। আর সরকারি খাতের অংশ মাত্র ১৪ শতাংশ। অর্থনীতির সুবিশাল খাত হয়েও দীর্ঘদিন ধরেই বেসরকারি খাত নানামুখী চাপের মধ্যে রয়েছে।

দেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের অবদান সবচেয়ে বেশি, ৮৬ শতাংশ। আর সরকারি খাতের অংশ মাত্র ১৪ শতাংশ। অর্থনীতির সুবিশাল খাত হয়েও দীর্ঘদিন ধরেই বেসরকারি খাত নানামুখী চাপের মধ্যে রয়েছে। বর্তমানে খাতটিতে তারল্য সংকট প্রকট। আশঙ্কা রয়েছে, খাতটিতে তারল্য সংকট জরুরি ভিত্তিতে দূর করা না গেলে দেশের অর্থনীতি আরো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে।

বেসরকারি খাত তীব্র তারল্য সংকটে থাকার পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—এক. শিল্প উৎপাদন আশানুরূপ না হওয়া। দুই. ঋণের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। তিন. ঋণের উচ্চ সুদহার।

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে বহুদিন ধরেই বিভিন্ন কলকারখানায় উৎপাদন গতি শ্লথ হয়ে এসেছে। উপরন্তু জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে এর প্রভাব পড়ে উৎপাদনে। বন্ধ হয়ে যায় অনেক কারখানা। সরকার পরিবর্তনের পর শ্রমিক অসন্তোষের জেরেও অনেক কারখানা বন্ধ ছিল। এভাবে ঘটনা পরিক্রমায় শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।

একদিকে উৎপাদন গতি শ্লথ, অন্যদিকে ব্যাংক থেকে ঋণপ্রবাহও কমেছে। বিগত সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার অত্যধিক বেড়ে গেছে। সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা বেড়ে গিয়েছিল। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাই কম নির্ধারণ করা হতো। ব্যাংক খাত এক ধরনের ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। এ মুহূর্তে আমানত সংগ্রহ ও প্রবৃদ্ধির হার কোনো কোনো ব্যাংকে ঋণাত্মক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) ব্যাংক খাতে আমানত কমেছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংকগুলোও নগদ অর্থ সংকটে থাকায় ঋণ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুলাই শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ ছিল ১৬ লাখ ৪১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা। আগস্ট শেষে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৪২ হাজার ৭০২ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক মাসে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ।

আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদহারের ভারিত গড় ছিল ১১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ব্যবসায়ীদের মতে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের সুদহার এখন ১৪-১৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকছে। আবার সংকটে থাকায় গ্রাহকের টাকা দিতে পারছে না কয়েকটি ব্যাংক। এতে ব্যবসা কার্যক্রম পরিচালনায় হিমশিম খেতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।

এছাড়া দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচারে নতুন বিনিয়োগের মাত্রাও কমেছে। এ বিষয়ও বেসরকারি খাতে তারল্যের সংকটকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। আবার বিনিয়োগ কমায় এ খাতে কর্মসংস্থানও বাড়ছে না। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় দেশে ক্রমেই বেকারত্বের হার বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের বেসরকারি খাতকে দ্রুত চাঙ্গা করা আবশ্যক। নয়তো অর্থনীতির চাকা অধিক গতিশীল করা সম্ভব হবে না। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ঠিক রাখতে হলে সরকারকে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে ভূমিকা নিতে হবে। খেলাপিদের বিরুদ্ধে জোরালো পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের কথা মাথায় রেখেই বেসরকারি খাতকে চাপমুক্ত করতে হবে।

দেশের বেসরকারি খাত এমনিতেই এখন তারল্য সংকটে ভুগছে। চাহিদা অনুপাতে চলতি মূলধন না পাওয়ায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। ফলে সংকুচিত হয়ে পড়ছে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য। এছাড়া তারল্যের সংকট চলছে দেশের পুঁজিবাজারেও। এ পরিস্থিতিতে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিলে বেসরকারি খাত আরো নাজুক পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে।

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বর্তমানে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক দফায় দফায় নীতি সুদহার বাড়িয়েছে। সর্বশেষ বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে করেছে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ। এরই মধ্যে আবার ব্যাংকটি পূর্বাভাস দিয়েছে যে আগামী মাসেও এ সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়তে পারে। যদি আগামী মাসে সুদহার বাড়ে তবে তা দুই অংেকর ঘরে পৌঁছবে। কিন্তু সুদহার দফায় দফায় বাড়ার পরও মূল্যস্ফীতি কমার ক্ষেত্রে এর তেমন কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। উল্টো বাড়তি সুদ গুনতে গিয়ে বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা মুহ্যমান প্রায়। কমেছে দেশে বিনিয়োগপ্রবণতা। বড় ধাক্কা লেগেছে উৎপাদন, আমদানি, কর্মসংস্থান, সরবরাহ শৃঙ্খলসহ বাজার ব্যবস্থাপনায়ও। এতে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে মূল্যস্ফীতি আরো স্ফীত হচ্ছে। সুতরাং বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বেসরকারি খাতের সংকট বিবেচনায় সুদহার বাড়ানোর বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি। বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করতে চাইলে শুরুতেই সরকারকে এ বিষয়ে যথাযথ সিদ্ধান্তে আসতে হবে।

দ্বিতীয়ত, দেশের ব্যাংক খাতের আমূল সংস্কার প্রয়োজন। আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোয় মনোযোগ দিতে হবে। আমানত প্রবৃদ্ধি না হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে আরো মন্থরগতি নেমে আসবে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ উদ্ধারের দিকে নজর দিতে হবে। সরকারকে চেষ্টা করতে হবে ব্যাংক থেকে ঋণ কম নেয়ার আর সরকার যদি ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয় তবে তা যতটা সম্ভব উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করা দরকার। ব্যাংক থেকে উদ্যোক্তারা ঋণ নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও কলকারখানা স্থাপনে বিনিয়োগ করলে তা দেশের অর্থনীতির গতিশীলতা বাড়াবে। তৈরি হবে কর্মসংস্থান। সার্বিকভাবে তা জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে এমন সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে বেরিয়ে আসতে হবে। বেসরকারি খাতকে সহায়ক শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

এর জন্য সরকারের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। আর্থিক ও ব্যাংক খাতের সংস্কার সাধন করে বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ যেমন নিশ্চিত করতে হবে, পাশাপাশি জ্বালানি সংকটসহ বিরাজমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে হবে। এতে আশা করা যায়, শিল্প উৎপাদন অব্যাহতভাবে বজায় থাকবে, আরো গতিশীল হবে।

আরও